আইনসিদ্ধ না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে -মাহবুব তালুকদার

নিজস্ব প্রতিবেদক>> নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে নিজেদের কলঙ্কিত করতে চাই না। আমরা জানি, আপনারা কেউ কলঙ্কের ভাগিদার হতে চাইবেন না। সুতরাং নির্ভয়ে ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। আপনারা ব্যর্থ হলে নির্বাচন ব্যর্থ হবে।

 

সোমবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করতে এসে তিনি এ কথা বলেন। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের অডিটরিয়াম এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

 

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন-নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান ও নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুক। প্রশিক্ষণে কয়েক ধাপে অংশ নিচ্ছেন সারা দেশের মোট ২ হাজার ২৬ জন কর্মকর্তা। সোম ও মঙ্গলবার নয়টি জেলার মোট ৪০৮ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।

 

মাহবুব তালুকদার বলেন, নির্বাচন কমিশন বিধি মোতাবেক জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করতে না পারলে তা ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, আইন যদি নিজস্ব গতিতে না চলে, তাহলে কোনো কার্যক্রম আইনানুগ হতে পারে না। সবার জন্য সমভাবে আইন প্রয়োগ না করলে সে আইন নয়, তা আইনের অপলাপ মাত্র।

 

তিনি বলেন, আইনসিদ্ধ না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে আমরা নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না। আমরা জানি, আপনারা কেউ কলঙ্কের ভাগিদার হতে চাইবেন না। সুতরাং নির্ভয়ে ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। ‘আপনারা ব্যর্থ হলে নির্বাচন ব্যর্থ হবে। আপনারা সফল হলে উদ্ভাসিত হবে পুরো জাতি। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখসমরের মতো নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সাফল্যের কোনো বিকল্প নেই।’

 

নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করতে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দৃঢ় থাকারও নির্দেশ দেন মাহবুব তালুকদার।

 

নির্বাচন কমিশনার বলেন, দেশে নানা সময় নানা প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, কখনো সেনা–সমর্থিত সরকারের অধীন কিংবা কখনো দলীয় সরকারের অধীনে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে প্রক্রিয়াই হোক না কেন, তাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে দেওয়া যাবে না। দেশে নির্বাচনের কোনো ধারাবাহিক রীতি গড়ে না উঠলেও একটি পূর্ণাঙ্গ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে এই ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে যাচ্ছে কমিশন। এ জন্য জনমনে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

 

ইসি কমিশনার মাহবুব তালকুদার বলেন, সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থী যেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, সে ব্যবস্থা করবেন। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে চাওয়া খুবই সামান্য—একজন ভোটার যেন নির্ভয়ে পছন্দমতো তার প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সেই আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

 

মাহবুব তালুকদার বলেন, এই কর্মসূচিতে আপনারা নির্বাচনের গুরুত্ব অনুধাবন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হবেন। জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য এই প্রশিক্ষণ দেবে দক্ষতা ও সক্ষমতা।

 

নির্বাচনকে ভিন্ন খাতে যেন প্রবাহিত না করা হয় সেজন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে তিনি বলেন, আপনাদের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অতি সামান্য। ভোটারার ভোটকেন্দ্রে যেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, এই সামান্য চাওয়াই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশাল কর্মযজ্ঞে রূপান্তরিত হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থী আপনাদের দিকে তাকিয়ে যেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।

 

তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ শক্তি আপনাদের কতটুকু, তা আপনাদের প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে জেনে নেবেন। আমার মনে হয়, আপনাদের সর্বোচ্চ শক্তি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।৷বক্তব্যে তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের প্রতিটি কার্যকলাপ, প্রতিটি পদক্ষেপ- সকলে প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সেদিক থেকে এ নির্বাচন আমাদের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্বাচন। কিছু্তেই আমরা সম্ভ্রম খোয়াতে পারি না।

 

নির্বাচন কমিশনার বলেন, গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ থকে ১২ লাখ কর্মকর্তা যুক্ত হবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনিয়ম রোধ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায়, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা জেনে নিতে তিনি নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘কতটুকু ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে, তা জেনে নেবেন। পুলিশ বা সামরিক কর্মকর্তাদের চেয়ে আপনাদের ক্ষমতা কোনো অংশে কম নয়।’

 

নির্বাচনের দায়িত্বে এসব কর্মকর্তার শিথিলতা কমিশন বরদাশত করবে না বলেও জানান মাহবুব তালুকদার। নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।

 

নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনের শপথের অংশীদার উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘আমাদের শপথ আপনাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। আপনারাও মনে মনে শপথ গ্রহণ করুন, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবেন। আপনাদের দায়িত্বশীল আচরণই দেশে এক সোনালি অধ্যায়ের রচনা করবে। মনে রাখতে হবে, আপনারা জাতির ক্রান্তিলগ্নে মহান দায়িত্ব পালন করছেন। আপনাদের সাফল্যে গৌরবদীপ্ত হবে, উদ্ভাসিত হবে দেশের জনগণ। বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার সুযোগ এই নির্বাচন। আমরা বিশ্বের সামনে আমাদের সম্ভ্রম খোয়াতে পারি না।’ মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করে সবার প্রতি সমান প্রয়োগ করার আহ্বান জানান মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেন, ‘আসুন, শুদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।’

 

অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, মনোনয়ন অবৈধ ঘোষিত প্রার্থীরা তাঁদের প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনে আপিলের সুযোগ পাবেন। ৬ থেকে ৮ ডিসেম্বর আপিলের বিষয়ে নিষ্পত্তি করবে কমিশন।

 

এর আগে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমাদান প্রক্রিয়া বেশ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন নির্বাচন কমিশন সচিব।

 

তিনি জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে ১৩ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশন। মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নির্দেশনা দেওয়া হবে ওই বৈঠকে।

 

১৩ ডিসেম্বরের পর কমিশনাররা বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন বলে জানান নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

Please follow and like us:
RSS
Facebook
Facebook
Google+
http://sangbadkantho.com/2018/12/%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%9a%e0%a6%a8/
Twitter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *